এরশাদুল বারী : সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ৩ কোটি ৫৩ লাখ (৪৬.৬%) ভোট পেয়ে ভুমিধস বিজয় পেয়েছে বিএনপি জোট। অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপি জোট ৩ কোটি ৩৩ লাখ ভোট পেয়ে পরাজিত হলেও তাদের ইতিহাসে এই প্রথম বিপুল স্ংখ্যক ভোট পেয়েছে ও সংসদীয় আসনে বিজয়ী হয়েছে। বিএনপির এই নিরঙ্কুশ জয় ও জামায়াত জোটের পরাজয়ের পেছনে যেসব কারণ প্রধান ফেক্টর হিসেবে কাজ করেছে।
বিএনপির ভুমিধস বিজয়ের পেছনে যে ৪ কারণ:
১. খালেদা জিয়ার মৃত্যু: নির্বাচনের ঠিক দুই মাস আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু দেশের মানুষকে বিএনপির প্রতি এক সফ্ট কর্ণার তৈরি করে দিয়েছে যেটার ফলাফল সরাসরি ভোটে পড়েছে।
২. তারেক-জুবাইদা-জাইমা ক্যারিশমা: প্রায় দীর্ঘ ১৭ বছর পর নির্বাচনের ঠিক আগে মোক্ষম সময়ে দেশে ফিরে এক চমক দেখায় জিয়া পরিবারের নতুন তিন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তারেক রহমান, স্ত্রী জোবায়দা রহমান এবং কন্যা জাইমান রহমান। তরুণ এই তিন কর্ণধারেরর নেতৃত্বে নতুন কৌশলের প্রচারণায় মানুষের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৩. পতীত আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক : ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পলায়নের পর থেকে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রধান প্রতিপক্ষই ছিল পতীত হাসিনার আওয়ামী লীগ এবং ভারত ।বিএনপি আওয়ামি বিরোধীতা করলেও তারা কিছুটা কৌশলী ছিল যার কারণে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকে তাদের পক্ষে ব্যাপক একটা প্রভাব ফেলেছে নির্বাচনের ফলাফলে।
৪. সরকার পরিচালনার অতিত অভিজ্ঞতা ও ফ্যামিলি কার্ড : জামায়াত-এনসিপির জোটের সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকার বিপরীতে বিএনপি’র কয়েক দফায় সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতাকে মানুষ মূল্যায়ন করেছে। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারণায় ফ্যামিলি কার্ড ইস্যুটা তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এছাড়া নারীদের ভোটটাও বিএনপি’র দিকে বেশি ঝুকেছে।
জামায়াত-এনসিপি জোটের পরাজয়ের পেছনে প্রধান যে ৪ কারণ:
১. ইসলামী জোটে ভাঙ্গন এবং হেফাজত ও চর্মনাই পীরের চরম বিরোধিতা : নির্বাচনের বছর খানেক আগে থেকেই ইসলামী দলগুলোর এক ভোট ব্যাংকের কথা বললেও শেষ পর্যন্ত সেটা ভেঙে যায় এবং তার ফলশ্রুতিতে কওমিপন্থী বা পীর পন্থী যে ইসলামী শক্তি আছে হেফাজতে ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তারা সরাসরি জামাতের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। এবং তারা বিশেষ করে হেফাজতের আমীর বিএনপির পক্ষে সমর্থন দিয়েছে। অথচ জামায়াত জোট সারাদেশে মাত্র ২০ লাখ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। হেফাজতে ও ইসলামী আন্দোলন জামায়াত-এনসিপি জোটের পক্ষে থাকলে হয়তো বা ফলাফল অন্যরকম হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
২. সরকার পরিচালনার অতীত অভিজ্ঞতা না থাকা ও সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্রীক অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী হওয়াও নির্বাচনে তাদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করছে অনেকেই।
৩. কোন নারীকে মনোনয়ন না দেওয়া ও নারী কেন্দ্রিক নেতিবাচক প্রচার : জামায়াতের বিরুদ্ধে দেশের মানুষের বড় একটি অংশের নেতিবাচক ধারণা হচ্ছে তারা নারীদের স্বাধীনতা চায় না বা নারীদের তারা ঘরে বন্দি রাখতে চায়। অথচ এই প্রশ্নের জবাব তারা এমপি মনোনয়নে নারী প্রার্থী দেয়ার মাধ্যমে মানুষের কাছে তুলে ধরার সুযোগ পেত সেটা হাতছাড়া করেছে। একজন নারীকেও মনোনয়ন না দেয়া, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহুর্তে জামায়াতের আমীর পদে নারীর নিষেধাজ্ঞা থাকা বলে সাক্ষাতকারে বলা এবং নারীদের নিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় প্রতিপক্ষের নেতিবাচক প্রচারনা দেশের অর্ধেক নারী ভোটারদের অনেককে ব্যাপক ভাবিয়ে তুলেছে যে তারা ক্ষমতায় গেলে নারীদের কোথায় নিয়ে যাবে।যার ফলাফল ভোটে পড়েছে।
৪. আওয়ামী লীগ এবং মিডিয়ার নেগেটিভ প্রচারণা : জামায়াত-এনসিপি জোট ছিল সরাসরি আওয়ামী লীগের শত্রু যার কারণে তাদের যে ভোট ব্যাংক এবং ভারতীয় ন্যারেটিভ সম্পূর্ণ জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে কাজ করেছে এবং নেগেটিভ প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া ফ্যাসিস্ট তৈরিতে যে মিডিয়া ব্যাপক ভুমিকা রেখেছিল সেই কুশিলবদের একটি বড় অংশ জামায়াতের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে ব্যাপক মাত্রায়।
তবে জয় বা পরাজয়ের পেছনে যেসব কারণই থাকুক দীর্ঘ সময় যেহেতু এই দুই দল একসাথে চলা, সরকার এবং বিরোধী দলে থেকে দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এরই মধ্যে জামায়াতের আমীর নতুন সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। অন্যদিকে তারেক রহমানও বলেছেন কোন ভেদাভেদ নয়, সবাইকে সাথে নিয়েই তারা চলতে চান। সুতরাং বিজয়ীদের আত্ম অহংকার পরিহার করে বিরোধীদের সহযোগীতা নিয়ে এক সাথে দেশ পরিচালনা করুন এটাই এখন সাধারণ মানুষের চাওয়া।
বিএনপির উচিত হবে ডক্টর ইউনুস এর মতো ভালো কিছু মানুষকে রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রী পরিষদে জায়গা করে দিয়ে সুন্দরভাবে দেশ পরিচালনা করে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করা। তাহলে তাদের অতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে বিশেষ করে ঋণ খেলাপি বা দুর্নীতিবাজদের কোন ভাবে যেন আশ্রয় প্রশ্রয় না দেওয়া হয়। একই সাথে তাদের এটাও মাথায় রাখতে হবে যে বিএনপিকে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ভোটার সমর্থন দিলেও বিরোধী জোটকেও কিন্তু সমর্থন দিয়েছে ৩ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ ।সুতরাং বিশাল সংখ্যক এই ভোটারের বিষয়টি মাথায় রেখে, প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার ও জুলাই বিপ্লকে গুরুত্ব দিয়েই তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার এগিয়ে নিয়ে যাবে দেশকে নতুন এক সুন্দর গন্তব্যের দিকে।
লেখক : এরশাদুল বারী, প্রবাসী সাংবাদিক।






