শাকির আহমাদ :
বাসা বাড়ির ফ্লাট আর এপার্টমেন্ট ও কর্পোরেট অফিসগুলোর অন্দরসজ্জ্বায় কাঠের বিকল্প হিসেবে প্লাইউড বোর্ডের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাঠের তুলনায় প্লাইউড বোর্ড অনেক সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় বোর্ড শিল্পের মোট বাজারের ৪৫% শেয়ার প্লাইউড বোর্ড দখল করে রেখেছে।
বর্তমানে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় অর্ধশত কোম্পানি প্লাইউড বোর্ড উৎপাদনে নিয়োজিত আছে যারা প্রতি বছর প্রায় তেরো’শ কোটি টাকার প্লাইউড বোর্ড বাজারে সরবরাহ করছেন।
প্লাইউড বোর্ড হলো এক ধরনের কাঠের পণ্য, যা বিভিন্ন স্তরের পাতলা কাঠের টুকরা একসাথে আঠা দিয়ে চেপে তৈরী করা হয়। এই বোর্ড সাধারণত শক্ত, স্থিতিশীল হয়ে থাকে । প্লাইউড উৎপাদনে প্রথমে আম, আকাশী, তুলা, সেগুন, রেইনট্রি বা ইউক্যালিপটাস গাছের কাঠ সংগ্রহ করা হয় । কাঠগুলো পরে একটি নির্দিষ্ট আকারে কাটা হয় । এরপর কাঠের টুকরাগুলিকে মেশিনের সাহায্যে পাতলা স্তরের শিটে পরিণত করা হয়। পাতলা কাঠের শিটগুলো একে অপরের ওপর বিপরীত দিক দিয়ে সন্নিবেশিত করা হয় এবং একে একে স্তরবদ্ধ করা হয়। প্রতিটি স্তরের মাঝে শক্তিশালী আঠা প্রয়োগ করা হয় যাতে তা একে অপরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে আটকে থাকে।শুকিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষ প্রেসিং মেশিনে প্লাইউড বোর্ডগুলো চেপে রাখা হয়। এর পর সন্নিবেশিত শীটগুলোর ওপর বিভিন্ন ফাইভারের ভিনিয়ার পেস্টিং করে বাজারজাত করার জন্য প্লাইউডগুলো প্রস্তুত করা হয়।
একটি প্লাইউড বোর্ড সাধারণত ৮ ফিট দৈর্ঘ্যের ও ৪ ফিট প্রস্থের হয়ে থাকে। ৩২ স্কয়ার ফিটের এই বোর্ডটি ৬, ১০ , ১২, ১৫,১৮ ও ২৫ মিলিমিটারের (এমএম) পুরুত্বের হয়ে থাকে । অধিকাংশ কাজে ১৮ এমএম আর ৬ এমএম প্লাইউডের ব্যবহার বেশি করে থাকেন আর্কিটেক্ট ও বোর্ড মিস্ত্রিরা। ফ্লাট আর এপার্টমেন্ট বাসার কিচেন কেবিনেট, ওয়াল কেবিনেট, সিলিং, আলমিরা আর কর্পোরেট হাউসগুলোর অন্দরসজ্জ্বায় ব্যবহারের জন্য এতো বড় অংশের কাঠ পাওয়া দুষ্কর ও সময়সাপেক্ষ। ৩২ স্কয়ার ফিটের প্লাইউড বোর্ড স্বল্প সময়ে ও সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যায় বলে বোর্ড মিস্ত্রিরা বিভিন্ন অংশে কেটে পরিমাপ মতন অন্দরসজ্জ্বার কাজে ব্যবহার করতে পারেন বিধায় প্লাইউডের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন অবকাঠামোর নির্মাণ কাজেও ১৮ এমএম পুরুত্বের প্লাইউড ব্যবহার করা হচ্ছে। এক সিএফটি গর্জন কাঠের বর্তমান বাজার দাম দুই হাজার পাঁচশত টাকা। ১৮ এমএম পুরুত্বের ৮ফিট বাই ৪ ফিট ১টি প্লাইউড বোর্ডের সিএফটি হয় এক দশমিক আট যার মূল্য দাড়ায় চার হাজার সাতশত টাকা। এক দশমিক আট সিএফটির সমপরিমাণ একটি প্লাইউড বোর্ড বাজারে পাওয়া যায় দুই হাজার পাচশত থেকে তিন হাজার পাঁচশত টাকার মধ্যে। ফলে ক্রেতার এখানে বারোশ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। তাছাড়াও কাঠ ভালো করে সিজনিং করা না হলে বেঁকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে প্লাইউড বোর্ড মেশিনের সাহায্যে সিজনিং করা হয় বলে খুব বেশি বাঁকা হয় না। ক্যামিক্যালি ট্রিট করা হয় বলে গুণে ধরার সম্ভাবনাও অনেক কম থাকে।
বর্তমানে যারা প্লাইউড উৎপাদন করছেন তাদের মধ্যে রয়েছে আহমেদ প্লাইউড ( সাব ব্রান্ড আসাম প্লাইউড), মায়া প্লাইউড, মরিয়ম প্লাইউড, এম এন্ড বি প্লাইউড, স্টার পারটেক্স প্লাইউড, সুপার প্লাইউড, এমআরএস প্লাইউড, আকিজ প্লাইউড, আম্বার প্লাইউড, উডল্যান্ড প্লাইউড, মডার্ন প্লাইউড, আলামিন প্লাইউড, মা প্লাইউড, রয়েল প্লাইউড (সাব ব্রান্ড সাহারা প্লাইউড), সুপ্রিম প্লাইউড, সিটি প্লাইউড, লরেল প্লাইউড, গুপ্তা প্লাইউড ( সাব ব্রান্ড রিয়া), আশিক প্লাই্উড (সাব ব্রান্ড সোনালি), জেএম প্লাইউড (সাব ব্রান্ড রনি প্লাইউড, এস.এ. প্লাইউড, ইকোনো প্লাইউড), আর.কে প্লাইউড, রহমান প্লাইউড(আমদানীকারক), পলি প্লাইউড, অটোবি প্লাইউড, আক্তার প্লাইউড, সেনচুরি প্লাইউড, বিসিএল প্লাইউড (সাব ব্রান্ড মমো প্লাইউড), উডটেক প্লাইউড, উডমার্ট প্লাই্উড, উডওয়ার্ল্ড প্লাইউড, বেংগল প্লাইউড (সাব ব্রান্ড জ্যোতি প্লাইউড), ফাইভস্টার প্লাই্উড, আজাদ প্লাইউড, ন্যাচার প্লাইউড, আমাদের প্লাইউড, বিউটি প্লাইউড ও ইউনাইটেড প্লাই্উড।
উল্লেখিত ব্রান্ডগুলোর সরবরাহ করা প্লাইউড ছাড়াও বাহিরের দেশ থেকে বছরে আরও দুইশো কোটি টাকার প্লাইউড বোর্ড আমদানী করা হয়ে থাকে যার ফলে দেশে মোট প্লাইউডের বাজার দাড়ায় প্রায় ১৫শ কোটি টাকা।
দেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদন সক্ষম প্লাইউড কোম্পানি আহমেদ প্লাইউড যার মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা হচ্ছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। মহুবর রহমান পার্টিকেল মিলস লি. -মায়া প্লইউডের উৎপাদন সক্ষমতা ১০ কোটি টাকা, সুপার বোর্ডের প্লাইউড উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৮ কোটি টাকা, মরিয়ম প্লাইউডের ৪ কোটি টাকা। আর বাজারের অন্যান্য প্লাইউড কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা হলো ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত। সম্প্রতি এম এন্ড বি ও উডল্যান্ড প্লাইউড এন্ড পার্টিকেল বোর্ড মিলস লি. তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ১০ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে জানা গেছে।
দেশীয় বড় কোম্পানিগুলো প্লাউউড ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগে খুব বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে না । কারণ প্লাইউড উৎপাদনে ম্যানুয়াল সিস্টেমে বেশি কাজ করতে হয় যা সময় সাপেক্ষ। অন্যদিকে পার্টিকেল বোর্ড ইন্ডাস্ট্রিতে সকল কাজ অটোমেশেন প্রক্রিয়ায় করা যায় বলে আমাদের দেশের বিনিয়োগকারীরা প্রথমেই পার্টিকেল বোর্ড শিল্পের প্রকল্প গ্রহণ করে থাকেন। উদাহরণস্বরুপ বলা যেতে পারে -আকিজ গ্রুপ প্রথমে পার্টিকেল বোর্ড পরবর্তীতে প্লাইউড বোর্ড উৎপাদনে বিনিয়োগ করেছে, টি.কে. গ্রুপের সুপার বোর্ডও পার্টিকেল বোর্ডে সফল হওয়ার পর প্লাই্উড বোর্ড বাজারে নিয়ে এসেছে। আম্বার বোর্ডও পার্টিকেল বোর্ড বাজারে নিয়ে আসার অনেক পরে প্লাইউড বাজারজাত করে।
সম্প্রতি ওয়াল্টন গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফার্ভেন্ট মাল্টিবোর্ড ইন্ডাস্ট্রিস লি: জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলে পার্টিকেল বোর্ডে বিনিয়োগ করেছে। পরবর্তীতে প্লাইউড উৎপাদনে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছে।
বিশ্বের সব দেশেই প্লাইউড কোম্পানিগুলো ম্যানুয়াল সিস্টেম অনুসরণ করে প্লাইউড বোর্ড উৎপাদন করে থাকেন। তবে ইউরোপ ও আমেরিকার কয়েকটি দেশ প্লাই্উড উৎপাদনে অটোমেশন পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্লাইউড বোর্ড উৎপাদন করছেন। দেশের বড় কোম্পানিগুলো নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশেও প্লাইউড উৎপাদনে অটোমেশন পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করবে বলে অনুমিত হচ্ছে । কেননা বাংলাদেশের বোর্ড শিল্পের প্রায় অর্ধেক বাজার প্রতিনিধিত্ব করছে এই ইন্টরিয়র ও ডেকোরেশন মার্কেট। সিক্স ডব্লিউ রিসার্চ নামের ভারতের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে বাংলাদেশে বোর্ড শিল্পের ৪৮ শতাংশ বাজার দখল করে আছে এই ইন্টরিয়র ও ডেকোরেশন সেগমেন্ট । ইন্টরিয়র ও ডেকোরেশন বাজারের প্রধান ব্যবহার্য বোর্ড হচ্ছে প্লাইউড বোর্ড।
প্লাইউড বোর্ডের ব্যবহার আমাদের বনের কাঠের ওপর চাপ কমাচ্ছে যা বন উজাড় রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
একটি দেশের মোট ভূমির শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকতে হয় যেখানে আমাদের দেশে রয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ। বনভূমির পরিমাণ বাড়াতে ‘বাংলাদেশ পার্টিকেল বোর্ড ম্যানফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টারস -বিপিবিএমইএ’ সংগঠনটির উদ্যোগে বনায়ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার গাছের চারা রোপণ করে বন ও পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি দেশের টেকসই উন্নয়ন ও জাতিসংঘের এসডিজি-টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০ অর্জনে প্লাইউড বোর্ড কোম্পানিগুলোর এগিয়ে আসা উচিত।
লেখক : সেলস প্রফেশনাল, ফার্ভেন্ট মাল্টিবোর্ড ইন্ড্রাসট্রিস লি:






