শাকির আহমাদ :
সরাসরি কাঠ ব্যবহার না করে গাছের ডালপালা, গুড়ি ও গাছের অব্যবহৃত অংশকে প্রক্রিয়াজাত করে পার্টিকেল বোর্ডকে কাঠের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার জন্য পার্টিকেল বোর্ড শিল্পের জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উডচিপসের প্লেইন বোর্ড, মেলামাইন বোর্ড ও এমডিএফ এই তিন ধরনের বোর্ডকে পার্টিকেল শিল্পের প্রধান পণ্য হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশে বছরে উডচিপসের প্লেইন বোর্ডের চাহিদা ১৬ লাখ, মেলামাইন বোর্ডের চাহিদা ৫০ লাখ, আর এমডিএফ বোর্ডের চাহিদা ২৩ লাখ। তিনটি বোর্ডের মোট চাহিদা ৮৯ লাখ। ১৬ মিলিমিটার পুরুত্বের ৮ ফিট ও ৪ ফিট প্রস্থের একটি বোর্ড এক দশমিক ছয় আট পরিমান সিএফট কাঠের সমপরিমাণ । সেই হিসেবে ৮৯ লাখ বোর্ড ব্যবহারের ফলে আমাদের দেশে ১ কোটি ৫০ লাখ সিএফটি কাঠ সংরক্ষিত হচ্ছে প্রতি বছর। পুরো গাছ না কেটে শুধু গাছের ডালপালা আর গুড়ি দিয়ে তৈরী করা বোর্ড ব্যবহার করায় দেড় কোটি সিএফটি কাঠ বেঁচে যাচ্ছে যা টেকসই বন ব্যবস্থপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এই পার্টিকেল বোর্ড শিল্প। ডিবিএইচইঞ্চিউচ্চতা- এই সূত্র ব্যবহার করলে একটি মাঝারি ধরনের গাছে সাধারণত ৮৮ সিএফটি পরিমাণ কাঠ পাওয়া যায়। দেড়কোটি সিএফটি কাঠে এক লক্ষ সত্তর হাজার পাঁচশত পরিমাণ গাছ হয় যা বন থেকে এই পরিমাণ গাছ কাটতে হচ্ছে না আসবাবপত্র শিল্পের জন্য।
অন্যদিকে বাসা-অফিসের ফার্নিচার বা অন্দরসজ্জ¦ার জন্য দেশে প্লাইউড বোর্ডও ব্যবহার করা হয়। প্লাইউড তৈরীতে গাছের মূল কান্ডের প্রয়োজন হয়। সাধারণত আম, আকাশী, তুলা, সেগুন, রেইনট্রি বা ইউকেলিপটাস গাছের মূল কান্ডকে প্লাইউড বোর্ডের প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দেশে বর্তমানে প্রতি বছর ৫০ লাখ প্লাইউডের বাজার রয়েছে যা চুরাশি লাখ ষাট হাজার সিএফটি কাঠের সমপরিমাণ। চুরানব্বই লাখ সিএফটি কাঠের সমপরিমাণ প্লাইউড তৈরীতে প্রতি বছর এক লক্ষ ছয় হাজার গাছ স্থানীয় বাগান বা বন থেকে কাটতে হচ্ছে।
পার্টিকেল বোর্ড শিল্পে গাছের মূল কান্ড ব্যবহার হয় না। আর প্লাইউড বোর্ড তৈরীতে গাছের কান্ড ব্যবহার হয়। উভয় ধরনের বোর্ড তৈরীতে মূল উপাদান হিসেবে সরাসরি গাছের নির্দিষ্ট অংশ ব্যবহার করতে হয় বলে গাছ বা টেকসই বন ব্যবস্থাপনায় এই শিল্পের কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের দেশে ২০০১ সালের পর থেকে পার্টিকেল বোর্ড শিল্পের বাজার বৃদ্ধি পেতে থাকে। বর্তমানে দেশে ৮ টি কোম্পানি পার্টিকেল বোর্ড উৎপাদন করে। আর প্লাইউড বোর্ড উৎপাদনে নিয়োজিত আছে অর্ধশত কোম্পানি। এই সব কোম্পানিগুলো গাছের ডালপালা বা কাঠ সংগ্রহ করেন স্থানীয় সরবরাহকারীদের থেকে। স্থানীয় কাঠ সরবরাহকারীগণ নিজস্ব বাগান বা ইজারা নেয়া সরকারি বন থেকে গাছের ডালপালা বা প্লাইউড বোর্ডের জন্য কাঠ সরবরাহ করে থাকেন।
গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বন ও পরিবেশ রক্ষায় পার্টিকেল বোর্ড শিল্পের প্রশংসনীয় ভূমিকা থাকলেও দেশের বনাঞ্চল বৃদ্ধি বা বনের টেকসই ব্যবস্থাপনায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য কর্মকান্ড হাতে নিতে দেখা যায়নি।
একটি দেশের মোট ভূমির ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকতে হয়। যেখানে আমাদের বাংলাদেশে মাত্র ১৭ শতাংশ বনভূমি রয়েছে। ৮ শতাংশ ঘাটতিতে থাকা এই বনাঞ্চল গড়ে তুলতে পার্টিকেল বোর্ড শিল্পকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। গত বছর আকিজ বোর্ড ২০ হাজার নানা জাতের চারা রোপণ করে। তবে এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে সব কোম্পানিগুলোকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে। পার্টিকেল বোর্ডের সব বোর্ডই ফার্নিচার শিল্পে ব্যবহার হওয়ায় দেশের ব্রান্ডের ফার্নিচার মালিকদেরও এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন।
পরিবেশ রক্ষার জন্য উন্নত বিশ্বে ফরেস্ট স্টুয়ার্ডশিপ কাউন্সিল (এফএসসি) সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যা বন সংরক্ষণের মাধ্যমে দায়িত্বশীল উৎপাদন নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের এফএসসি সার্টিফাইড বন গড়ে তোলার উদ্যোগ চোখে পড়ে না। বোর্ড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এফএসসি সার্টিফিকেশন পেতে উদ্যোগ নেওয়া এবং টেকসই বন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
এফএসসি (FSC- Forest Stewardship Council) হলো সুইজারল্যান্ডভিত্তিক একটি অলাভজনক সংস্থা, যা দায়িত্বশীল বন ব্যবস্থাপনা ও কাঠজাত পণ্যের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে। একই সাথে পরিবেশগত ভারসাম্য, সামাজিক দায়িত্ব ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। এটি নিশ্চিত করে যে কাঠ ও বনজ পণ্যগুলি দায়িত্বশীলভাবে আহরণ করা হয়েছে, যাতে বন সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্য রক্ষা হয়।
বাংলাদেশে এফএসসি সার্টিফিকেশন সরাসরি নেওয়া যায় না, কারণ এখানে এফএসসি-এর সরাসরি কার্যক্রম নেই। তবে, সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল-এসডিজি বাংলাদেশ এ বিষয়ে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সার্টিফিকেশন পেতে সহায়তা করে।
আমাদের দেশে হাতিল ফার্নিচার ও বসুন্ধরা পেপার মিলস এফএসসি সার্টিফাইড বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করে থাকে যা অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ ।
বহু উন্নত দেশে বোর্ড শিল্পের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যেমন ব্রাজিল ও কানাডায় বোর্ড কোম্পানিগুলো নির্দিষ্ট পরিমাণ গাছ রোপণের অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
সরকার যদি বোর্ড-প্লাইউড ও ফার্নিচার শিল্পের জন্য বাধ্যতামূলক বৃক্ষরোপণ নীতি গ্রহণ করে, তাহলে একদিকে যেমন কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে পরিবেশও রক্ষা পাবে।
লেখক: শাকির আহমাদ, সেলস প্রফেশনাল, ফারভেস্ট মাল্টিবোর্ড ইন্ডাস্ট্রিস লি:।






